রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা
- আপডেট সময় : ১১:১৯:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৪
- / 453
ধরে প্রবাসীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করেছেন, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবাসী আয়ের এই বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা হিসেবে কাজ করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি মূল সূচক। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ছে, তবুও নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) এখনো ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে, যা চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরের অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের মোট রিজার্ভ (গ্রস রিজার্ভ) ২৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ এখন ১৯.৮২ বিলিয়ন ডলার। এটি গত সপ্তাহের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ১৯.৭৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে আইএমএফের বিপিএম-৬ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও একটি গোপনীয় রিজার্ভ হিসাব রয়েছে যা শুধুমাত্র আইএমএফকে দেওয়া হয়, কিন্তু প্রকাশ করা হয় না। আইএমএফের পক্ষ থেকে দেশের রিজার্ভের উপর বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি শর্ত হলো ন্যূনতম একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হবে। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) বা ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৪.৭১ বিলিয়ন ডলারে। এই রিজার্ভ দিয়ে দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে না, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতি। সাধারণত, একটি দেশের অন্তত তিন মাসের আমদানির সমান রিজার্ভ থাকা উচিত। বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি বিবেচনায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলে ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কার মতো সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। তাই এই সংকট মোকাবেলায় কিছুদিন অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করতে হতে পারে।
আইএমএফের ঋণ সহায়তা
বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবেলায় ২০২২ সালের জুলাই মাসে আইএমএফের কাছে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চেয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২২ সালের নভেম্বরে ঋণ চুক্তি অনুমোদিত হয়। এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম কিস্তিতে ৪৭০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করে আইএমএফ। সেই সঙ্গে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮০ মিলিয়ন ডলার এবং জুনে তৃতীয় কিস্তির ১.১৫ বিলিয়ন ডলার পায় বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের মধ্যে আইএমএফের ঋণের সমস্ত কিস্তি প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা
প্রবাসী আয়ের বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রবাসীরা বৈধপথে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা ছিল গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের পর প্রবাসীরা আবার বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্যাম্পেইন শুরু করলে আগস্টে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২২২ কোটি ডলারে (২.২২ বিলিয়ন)। এরপর সেপ্টেম্বরে এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২৪০ কোটি ৪৮ লাখ (২.৪০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশীয় মুদ্রায় ২৮,৮৫৭ কোটি টাকা।
গত চার বছরে একক মাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার। প্রবাসীদের এই আয়ের বৃদ্ধির ফলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা দেখা গেলেও, নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) এখনও কম রয়েছে। আইএমএফের ঋণ সহায়তা এবং প্রবাসী আয়ের বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবেলা করার চেষ্টা চলছে। তবে এ সময়ে অর্থপাচার, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং টাকার মানের অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে আরও চাপের মধ্যে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশকে বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতার বাইরে আসার পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি, আরও সুসংহত রেমিট্যান্স ক্যাম্পেইন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।














