বাংলাদেশ ০১:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Insaf World Banner

আতঙ্কিত শহর: থামছে না আগুনের লেলিহান শিখা

ইমরান হোসেন, সম্পাদক, ইনসাফ বিশ্ব
  • আপডেট সময় : ০৯:১০:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  • / 147

ছবি: সম্পাদকীয় ইনসাফ বিশ্ব

Insaf World Banner
"ইনসাফ বিশ্ব" পত্রিকার নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সম্পাদকীয়

শিয়ালবাড়ি থেকে বিমানবন্দর: কাঠামোগত দুর্বলতায় মৃত্যুফাঁদ?

গত কয়েকদিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে ১৬ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার কারখানায় ১৭ ঘণ্টার যুদ্ধ এবং সর্বশেষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন—এই প্রতিটি ঘটনা আমাদের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও উদাসীনতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা শহর যেন এখন ‘বোমার শহর’। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বিএম ডিপো বা তাজরীনের মতো ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলো থেকে আমরা কার্যত কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করিনি। আজও শহরের জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউনগুলো নীরবে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিরপুরের ঘটনায় ১৬ জন শ্রমিকের প্রাণহানি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার ফলস্বরূপ ‘কাঠামোগত হত্যা’র আরেক দৃষ্টান্ত। এই শ্রমিকদের অনেকে আটকে পড়ে মারা গেছেন, কারণ ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ ছিল তালাবদ্ধ।

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের ইপিজেডের একটি সাততলা কারখানায় আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবনটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। ঠিক একইভাবে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার পর বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছে, যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারংবার আগুনের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে বারংবার বৈদ্যুতিক গোলযোগ, জ্বলন্ত বিড়ি-সিগারেট এবং গ্যাসের লাইন থেকে লিকেজের কথা উল্লেখ করা হলেও, মূল সমস্যা হলো বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিমালা ও সতর্কতার চরম লঙ্ঘন। অগ্নিনিরাপত্তা আইন অমান্য করে বহুতল ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক মজুত এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে প্রতিটি দগ্ধ লাশ যেন রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের প্রমাণ পেলে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। তবে কেবল তদন্তই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন: ১. সকল প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম অবিলম্বে আবাসিক এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা। ২. শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা সনদ কঠোরভাবে পরীক্ষা করা এবং ত্রুটিপূর্ণ ভবনগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া। ৩. জরুরি বহির্গমন পথে বাধা সৃষ্টির মতো অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

আমাদের অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না, জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। কর্তৃপক্ষের আশু সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতাই পারে এই ‘মৃত্যুপুরী’ থেকে শহরকে রক্ষা করতে। অন্যথায়, প্রতিবারই কোনো বড় ঘটনার পর আমরা কেবল শোক আর দীর্ঘশ্বাস নিয়েই পড়ে থাকব।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
Insaf World Banner 1

আতঙ্কিত শহর: থামছে না আগুনের লেলিহান শিখা

আপডেট সময় : ০৯:১০:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

সম্পাদকীয়

শিয়ালবাড়ি থেকে বিমানবন্দর: কাঠামোগত দুর্বলতায় মৃত্যুফাঁদ?

গত কয়েকদিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে ১৬ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার কারখানায় ১৭ ঘণ্টার যুদ্ধ এবং সর্বশেষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন—এই প্রতিটি ঘটনা আমাদের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও উদাসীনতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা শহর যেন এখন ‘বোমার শহর’। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বিএম ডিপো বা তাজরীনের মতো ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলো থেকে আমরা কার্যত কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করিনি। আজও শহরের জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউনগুলো নীরবে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিরপুরের ঘটনায় ১৬ জন শ্রমিকের প্রাণহানি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার ফলস্বরূপ ‘কাঠামোগত হত্যা’র আরেক দৃষ্টান্ত। এই শ্রমিকদের অনেকে আটকে পড়ে মারা গেছেন, কারণ ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ ছিল তালাবদ্ধ।

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের ইপিজেডের একটি সাততলা কারখানায় আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবনটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না। ঠিক একইভাবে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার পর বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছে, যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারংবার আগুনের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে বারংবার বৈদ্যুতিক গোলযোগ, জ্বলন্ত বিড়ি-সিগারেট এবং গ্যাসের লাইন থেকে লিকেজের কথা উল্লেখ করা হলেও, মূল সমস্যা হলো বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিমালা ও সতর্কতার চরম লঙ্ঘন। অগ্নিনিরাপত্তা আইন অমান্য করে বহুতল ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক মজুত এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে প্রতিটি দগ্ধ লাশ যেন রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের প্রমাণ পেলে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। তবে কেবল তদন্তই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন: ১. সকল প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম অবিলম্বে আবাসিক এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা। ২. শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা সনদ কঠোরভাবে পরীক্ষা করা এবং ত্রুটিপূর্ণ ভবনগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া। ৩. জরুরি বহির্গমন পথে বাধা সৃষ্টির মতো অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

আমাদের অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না, জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। কর্তৃপক্ষের আশু সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতাই পারে এই ‘মৃত্যুপুরী’ থেকে শহরকে রক্ষা করতে। অন্যথায়, প্রতিবারই কোনো বড় ঘটনার পর আমরা কেবল শোক আর দীর্ঘশ্বাস নিয়েই পড়ে থাকব।

সংবাদটি শেয়ার করুন :