বাংলাদেশ ০৩:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Insaf World Banner

সময়ের গোলকধাঁধা: বাংলা সনের উদ্ভব ও এক বিস্ময়কর রহস্যের বিবর্তন

সম্পাদক ইমরান হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৩:১৯:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
  • / 15

ছবি: সম্পাদক ইমরান হোসেন

Insaf World Banner
"ইনসাফ বিশ্ব" পত্রিকার নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সম্পাদকীয়:

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণের হিসাব যার হাত ধরে চলে, তা হলো বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন। কিন্তু এই সনের শুরুটা ঠিক কোথায়? এটি কি কেবলই একটি পঞ্জিকা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মোগল সম্রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের কৌশল আর প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ? আজ আমরা ফিরে তাকাবো সেই সুদূর অতীতে, যেখানে মিশে আছে সম্রাট আকবর, ফসল কাটা আর নক্ষত্রের চলন।

​প্রাচীনত্বের সন্ধানে: শশাঙ্ক না কি আকবর?

​বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক সাত শতকের শুরুর দিকে এই সনের সূচনা করেন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য মতটি হলো মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল। সম্রাট আকবর যখন সিংহাসনে বসেন, তখন হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু চন্দ্র মাসের ওপর ভিত্তি করে চলা হিজরি সন ঋতুর সাথে মিলত না, ফলে কৃষকদের ফসল কাটার আগেই খাজনা দেওয়ার চাপে পড়তে হতো। এই সংকট নিরসনেই জন্ম নেয় ‘ফসলি সন’, যা আজকের বাংলা সন।

​আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী ও বৈজ্ঞানিক জাদুকরী

​সম্রাট আকবরের রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী হিজরি চন্দ্র সন এবং হিন্দু সৌর সনের সংমিশ্রণে এই নতুন সনের কাঠামো তৈরি করেন। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বা ৯৬৩ হিজরিতে এই সনের প্রবর্তন হলেও এর গণনা শুরু করা হয় সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে। এই রহস্যময় গাণিতিক কৌশলের কারণেই বাংলা সন আজ হিজরি সনের সাথে একটি বিশেষ সংযোগ রক্ষা করে চলেছে। তৎকালীন সময়ে এই নতুন ব্যবস্থা কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, যা আজকের পহেলা বৈশাখ বা হালখাতার মূল ভিত্তি।

​পহেলা বৈশাখ: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব

​মোগল আমলের ‘পুণ্যাহ’ থেকে আজকের ‘পহেলা বৈশাখ’—বাংলা সনের বিবর্তন কেবল তারিখ পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ইতিহাসও বটে। এক সময় চৈত্র সংক্রান্তি এবং বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। ব্রিটিশ শাসনামল ও পরবর্তী পাকিস্তানি আমলে এই উৎসব বাঙালির জাতিসত্তা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ১৯৫৬ সালে নববর্ষকে সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান একে এক রাজনৈতিক মাত্রা দান করে।

​আধুনিক সংস্কার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

​সময়ের সাথে সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারের গণনায় কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে অধিবর্ষ বা লিপ-ইয়ার নিয়ে সমস্যার সমাধানে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ১৯৮৭ ও ২০১৯ সালে ক্যালেন্ডারটিকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করা হয়। বর্তমানে বৈশাখের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনে এবং বাকি মাসগুলো ৩০ দিনে গণনা করা হয়। এই সংস্কারের ফলে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের সাথে বাংলা সনের একটি স্থায়ী সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

​উপসংহার: শেকড়ের টানে নতুনের আহ্বান

​বাংলা সন আমাদের কেবল একটি তারিখ দেয় না, দেয় পরিচয়। এটি একটি জাতির ফসলের ঘাম, জমিদারের খাজনা এবং সাধারণ মানুষের উৎসবের এক অদ্ভুত দলিল। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা হয়তো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে অভ্যস্ত, কিন্তু বৈশাখের প্রথম ভোরে যখন সানাই বাজে, তখন আমরা ফিরে যাই সেই মোগল দরবারে কিংবা রাজা শশাঙ্কের গৌড়ে। সময়ের এই প্রবাহ যেন চিরকাল বাঙালির হৃদস্পন্দন হয়েই বেঁচে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
Insaf World Banner 1
Insaf World Banner 2

সময়ের গোলকধাঁধা: বাংলা সনের উদ্ভব ও এক বিস্ময়কর রহস্যের বিবর্তন

আপডেট সময় : ০৩:১৯:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

সম্পাদকীয়:

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণের হিসাব যার হাত ধরে চলে, তা হলো বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন। কিন্তু এই সনের শুরুটা ঠিক কোথায়? এটি কি কেবলই একটি পঞ্জিকা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মোগল সম্রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের কৌশল আর প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ? আজ আমরা ফিরে তাকাবো সেই সুদূর অতীতে, যেখানে মিশে আছে সম্রাট আকবর, ফসল কাটা আর নক্ষত্রের চলন।

​প্রাচীনত্বের সন্ধানে: শশাঙ্ক না কি আকবর?

​বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক সাত শতকের শুরুর দিকে এই সনের সূচনা করেন। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য মতটি হলো মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল। সম্রাট আকবর যখন সিংহাসনে বসেন, তখন হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু চন্দ্র মাসের ওপর ভিত্তি করে চলা হিজরি সন ঋতুর সাথে মিলত না, ফলে কৃষকদের ফসল কাটার আগেই খাজনা দেওয়ার চাপে পড়তে হতো। এই সংকট নিরসনেই জন্ম নেয় ‘ফসলি সন’, যা আজকের বাংলা সন।

​আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী ও বৈজ্ঞানিক জাদুকরী

​সম্রাট আকবরের রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী হিজরি চন্দ্র সন এবং হিন্দু সৌর সনের সংমিশ্রণে এই নতুন সনের কাঠামো তৈরি করেন। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে বা ৯৬৩ হিজরিতে এই সনের প্রবর্তন হলেও এর গণনা শুরু করা হয় সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে। এই রহস্যময় গাণিতিক কৌশলের কারণেই বাংলা সন আজ হিজরি সনের সাথে একটি বিশেষ সংযোগ রক্ষা করে চলেছে। তৎকালীন সময়ে এই নতুন ব্যবস্থা কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, যা আজকের পহেলা বৈশাখ বা হালখাতার মূল ভিত্তি।

​পহেলা বৈশাখ: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব

​মোগল আমলের ‘পুণ্যাহ’ থেকে আজকের ‘পহেলা বৈশাখ’—বাংলা সনের বিবর্তন কেবল তারিখ পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ইতিহাসও বটে। এক সময় চৈত্র সংক্রান্তি এবং বৈশাখী মেলা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। ব্রিটিশ শাসনামল ও পরবর্তী পাকিস্তানি আমলে এই উৎসব বাঙালির জাতিসত্তা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ১৯৫৬ সালে নববর্ষকে সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান একে এক রাজনৈতিক মাত্রা দান করে।

​আধুনিক সংস্কার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

​সময়ের সাথে সাথে বাংলা ক্যালেন্ডারের গণনায় কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে অধিবর্ষ বা লিপ-ইয়ার নিয়ে সমস্যার সমাধানে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ১৯৮৭ ও ২০১৯ সালে ক্যালেন্ডারটিকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করা হয়। বর্তমানে বৈশাখের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনে এবং বাকি মাসগুলো ৩০ দিনে গণনা করা হয়। এই সংস্কারের ফলে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের সাথে বাংলা সনের একটি স্থায়ী সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

​উপসংহার: শেকড়ের টানে নতুনের আহ্বান

​বাংলা সন আমাদের কেবল একটি তারিখ দেয় না, দেয় পরিচয়। এটি একটি জাতির ফসলের ঘাম, জমিদারের খাজনা এবং সাধারণ মানুষের উৎসবের এক অদ্ভুত দলিল। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা হয়তো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে অভ্যস্ত, কিন্তু বৈশাখের প্রথম ভোরে যখন সানাই বাজে, তখন আমরা ফিরে যাই সেই মোগল দরবারে কিংবা রাজা শশাঙ্কের গৌড়ে। সময়ের এই প্রবাহ যেন চিরকাল বাঙালির হৃদস্পন্দন হয়েই বেঁচে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :