দায়মুক্তির সংস্কৃতি: রাষ্ট্রের কাঁধে আর কত লাশের বোঝা?
- আপডেট সময় : ০৬:৩০:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫
- / 124
সম্পাদকীয়
অগ্নিকাণ্ড থেকে বিস্ফোরণ: কেন ব্যর্থ হচ্ছে সব সতর্কতা?
দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনবহুল এলাকাগুলোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে যোগ হয়েছে আরও বিপর্যয়। শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ শেষ না হতেই, যদি নতুন করে আরও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এটি পরিষ্কার যে আমাদের নিরাপত্তা জাল ছিন্নভিন্ন। এই ধারাবাহিক ট্র্যাজেডিগুলো প্রমাণ করে, সমস্যা নিছক দুর্ঘটনা নয়—এটি কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে জেঁকে বসা এক চরম ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’র ফল।
মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে ১৬ শ্রমিকের জীবনহানি, চট্টগ্রামের ইপিজেড কারখানার দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টার আগুন এবং বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থানে আগুনের ঘটনা—প্রতিটিই ছিল এক একটি সতর্ক সংকেত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা শুধু দুর্ঘটনা পরবর্তী তদন্ত কমিটির ঘোষণা আর ক্ষণিকের আহাজারিতেই থেমে থাকি। যে ভবন বা কারখানাগুলো অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছাড়াই চলছে, যে রাসায়নিক গুদামগুলো এখনো আবাসিক এলাকায় মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে আছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো স্থায়ী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায় না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: কেন প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ উদাসীন হয়ে যায়? তদন্ত প্রতিবেদনগুলো আলোর মুখ দেখে না কেন? নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা, বিএম ডিপো থেকে শিয়ালবাড়ী—প্রতিটি ট্র্যাজেডিতে যারা দায়িত্বে

অবহেলা করেছেন বা আইন লঙ্ঘন করেছেন, তাদের কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে? শাস্তির এই ঘাটতিই অন্যদেরকে একই অপরাধ বারবার করতে উৎসাহিত করছে। এটি যেন একটি দুষ্টচক্র: আগুন লাগে, মানুষ মারা যায়, তদন্ত কমিটি হয়, এবং তারপর সবাই ভুলে যায়—পরবর্তী আগুনের অপেক্ষায়।
এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত, কেবল অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিবৃতি দেওয়া নয়, বরং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। জনবহুল এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদে কোনো প্রকার সময়ক্ষেপণ না করা এবং অগ্নিনিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
যতদিন না পর্যন্ত এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্র বেরিয়ে আসতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত এই শহর একটি অনিশ্চিত ও জ্বলন্ত জনপদ হিসেবেই থাকবে। প্রতিটি নতুন অগ্নিকাণ্ড আমাদের কাঠামোগত ব্যর্থতার স্মারক হয়ে রাষ্ট্রের কাঁধে লাশের বোঝা চাপিয়ে দেবে। আর এই ভার বহন করতে হবে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকেই।

















