হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, মামুনের লঘুদণ্ড—জুলাই গণহত্যা মামলায় ঐতিহাসিক রায়
- আপডেট সময় : ০৪:০২:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
- / 45
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেছে। সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল–১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় প্রদান করে।
রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথম অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দ্বিতীয় অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধেও হত্যাযজ্ঞে প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও ভূমিকার প্রমাণ পেয়ে আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়।
অন্যদিকে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রাজসাক্ষীতে পরিণত হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয়েছে লঘুদণ্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। আদালত জানায়, মামুন সত্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করায় সর্বোচ্চ সাজা না দিয়ে লঘুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠ
৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় ছয় ভাগে বিভক্ত করে সারসংক্ষেপ পাঠ শুরু হয় দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে। আড়াইটার পর পর্যন্ত বিচারক সারসংক্ষেপ পড়েন। এতে বলা হয়, জুলাই–আগস্ট আন্দোলনকালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের বাহিনীসহ দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের ব্যবহার করে ব্যাপক দমন–পীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এসব নির্দেশের ফলে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আহত ও নির্যাতিত হয়, যা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে সেনা মোতায়েনের অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউন–শাটডাউনের নামে নাশকতা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
রায় সরাসরি সম্প্রচার
বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার করেছে এ ঐতিহাসিক রায়। রাজধানীর একাধিক মোড়ে বড় পর্দায় রায় ঘোষণার দৃশ্য দেখতে মানুষের ভিড় দেখা যায়।
আসামিদের বর্তমান অবস্থা
রায়ে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। মামুনই এই মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি ছিলেন, যিনি পরে রাজসাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
অভিযোগের বিবরণ
মামলায় প্রসিকিউশন মোট ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগ জমা দেয়। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণ চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠা, এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠা। তদন্তে উঠে আসে—হাসিনার সরাসরি আদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীসহ ছাত্রলীগ–যুবলীগ–স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়। পরিকল্পিত নৃশংসতায় দেশজুড়ে ঘটে দমন–পীড়ন, যা আদালতের কাছে প্রমাণিত হয়েছে।












