তেল আছে, তবু হাহাকার কেন?
- আপডেট সময় : ০৮:১৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
- / 5
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই—এমনটাই দাবি করছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত তেল এনে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় চালু রয়েছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও পাম্প বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন মালিকরা।
অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, একাধিক পাম্প ঘুরেও তারা তেল সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছেন। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক ও রাইড শেয়ারিং কর্মীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন।
সরকারি সূত্র জানায়, মজুত তেল উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৪ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মার্চ মাসে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অপরিশোধিত তেল দেশে পৌঁছাতে না পারায় ইআরএলকে সীমিতভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে। তবে এতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ফলে মার্চে ২ লাখ টন এবং এপ্রিলে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরব থেকে আসা এক লাখ টন তেলবাহী জাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি এবং রাস্তানুরা বন্দরে আটকে আছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসার কথা থাকা আরেকটি জাহাজের যাত্রাও স্থগিত হয়েছে।
তবে বিকল্প পথে সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি জাহাজ ২০ এপ্রিল রওনা দিয়ে মে মাসের শুরুতে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া মে মাসে আরও এক লাখ টন তেল সরবরাহের জন্য সৌদি আরবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত এক লাখ টন তেল আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে মজুত রয়েছে—১,০১,৩৮৫ টন ডিজেল, ৩১,৮২১ টন অকটেন, ১৮,২১১ টন পেট্রোল, ৭৭,৫৪৬ টন ফার্নেস অয়েল এবং ১৮,২২৩ টন জেট ফুয়েল। এই মজুত অন্তত দুই মাসের জন্য পর্যাপ্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। বর্তমানে চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রয়েছে। সাময়িক সীমাবদ্ধতা সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলেও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে ভর্তুকি দীর্ঘ সময় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, এপ্রিল মাসে দাম বাড়ানো হবে না। তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও। তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং শিগগির সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের চিত্র এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
একজন রাইড শেয়ারিং চালক দেলোয়ার হোসেন জানান, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে অল্প পরিমাণ তেল পেয়েছেন। জীবিকার জন্য তাকে এই কষ্ট সহ্য করতেই হচ্ছে।
পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণ হিসেবে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে বেশি করে তেল কেনাকে দায়ী করেছে সরকার। কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ আগের মতোই রয়েছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং অপ্রয়োজনীয় মজুত না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
























