পবিত্র কোরআন নাযিলের পূর্ব কথা
- আপডেট সময় : ১০:২৩:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ অক্টোবর ২০২৪
- / 463
হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর চল্লিশ বৎসর বয়সের প্রারম্ভেই তাহার আচার ব্যবহারের মধ্যে ভাবান্তর দেখা গেল। মানব সেবা ব্যতীত অন্য কোন সাংসারিক কাজে লোকের সঙ্গে তিনি কমই মেলামেশা করিতেন। অধিকাংশ সময় হেরা পর্বতের গুহায় বসিয়া তিনি পরমার্থিক চিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। দিনের পর দিন তিনি অলৌকিক ও অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখিতেন। সময় সময় তিনি অদৃশ্য লোকের শব্দও শুনিতে পাইতেন। একদিন হুজুর (সাঃ) খেজুর গাছের বাগানে একাকী বসেছিলেন। তখন সেখানে অন্য কোন জীব জন্তু ছিল না। চারিদিকে নীরব নিস্তব্ধ। সেই জনমানবহীন খেজুর বাগানে নীরবতা ভঙ্গ করিয়া একটি উচ্চ খেজুর গাছ হইতে শব্দ হযরতের কানে আসিতেছিল। এক অদৃশ্য ব্যক্তি বলিতেছিলেন “তুমি সমস্ত জগতের জন্য আল্লাহ তায়ালার কৃপা ও মঙ্গল স্বরূপ। তুমিই ইব্রাহিম (আঃ) এর ধর্মের বাহক”। হযরত এই আশ্চর্য জনক কণ্ঠস্বর শুনিয়া উৎসুক নেত্রে চারিদিকে তাকাইলেন কিন্তু সেই নীরব নিস্তব্ধতার মধ্যে কাউকেই দেখিলেন না। হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে প্রিয় নবী (সঃ) এর উপর ওহী নাযিলের সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তা দিনের আলোর মতো তার জীবনে প্রতিভাত হতো।
একবার হুজুর (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে স্বপ্নে দেখিলেন। দেখিলেন হাতে একটি বৃহৎ পতাকা নিয়ে কাবা ঘরের ছাদে দাঁড়াইয়া আকাশের দিকে তাকাইতেছেন। হযরত স্বপ্ন অবস্থায়তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন ওহে আলী (রাঃ) কি অবস্থা? তার উত্তরে হযরত আলী বলিলেন “স্বর্গীয় সুসংবাদ শুনিতেছি এবং আপনাকে স্বর্গ মর্তের মাঝখানে দেখিতে পাইতেছি। জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে ওহি প্রাপ্তির আগে আস্তে আস্তে তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে উঠেন। হেরা গুহায় নিভৃতে তিনি আল্লাহর ধ্যানে মশগুল হয়ে পড়েন এবং বিশাল সৃষ্টিও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। এভাবেই হেরা গুহায় তার রাত আর দিন কেটে যায়। খাবার ও পানি শেষ হয়ে গেলে শুধু মাত্র সে সব নেয়ার জন্যই বাড়ীতে ফেরেন। মাঝে মধ্যে প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রাঃ) ও হেরা গুহায় তাহাকে খাবার দিয়ে আসেন। কোরআন নাযিলের ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহ তা আলা নবী করিম (সঃ) কে স্বপ্নের মাধ্যমে এ মহান কাজের জন্য প্রস্তুত করে নিচিছলেন। ইতিহাসের প্রমাণ অনুযায়ী প্রথম ওহী এসেছিল রমজান মাসের ২১ তারিখ সোমবার রাত্রে। নবী করিম (সঃ) এর বয়স ছিল তখন ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন। ঐ দিন আল্লাহর হুকুমে ফেরেস্তা জিবরাইল (আঃ) সরাসরি ওহী নিয়ে এসে গভীর কন্ঠে বললেন পড় সুরা আলাক্ব এর ১-৫ আয়াত “ইক্রা বিস্মি রাব্বিকাল লাযী খালাক্ব। খালাক্বাল ইন-সা-না মিন আলাক্ব। ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরামূল। লাযী আল্লামাবিল কালাম। আল্লামাল ইনসানা মালাম ইয়ালাম। অর্থাৎ তুমি তোমার রবের নামে পাঠ কর যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে রক্ত পিন্ড হতে সৃষ্টি করেছেন। তুমি পাঠ কর তোমার রব মহিমান্বিত। তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন-যা সে জানত না। নবী করিম (সাঃ) বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। উদ্বেলিত কণ্ঠে বললেন আমি পড়তে জানি না। ফেরেস্তা তাকে বুকে চেপে ধরে আবার বললেন পড়ুন। তিনি পুনরায় বললেন আমি পড়তে জানি না। ফেরেস্তা আবার তাকে বুকে চেপে ধরে বললেন পড়ুন। তৃতীয়বার যখন ফেরেস্ততা তাকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিয়ে বললেন পড়ুন এবার নবী করিম (সাঃ) ওহির প্রথম পাঁচটি আয়াত অর্থাৎ সুরা আলাক্ব এর প্রথম পাঁচ আয়াত পাঠ করলেন।
অতঃপর তিনি ঘরে ফিরে গেলেন। জ্বরে কাপতে লাগলেন। তার স্ত্রী হযরত খাদিজা (রাঃ) কে বললেন কম্বল দিয়ে আমাকে ঢেকে দাও। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে আপনার? আপনি কাপছেন কেন? প্রিয় নবীজি হেরা গুহার সমস্ত ঘটনা তার স্ত্রীকে বললেন। তার স্ত্রী বললেন, আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কেননা আপনি মানুষের উপকার করেন, মানবতার সেবা করেন এবং এতিমদের আশ্রয় দেন। মহান আল্লাহ আপনার কোন ক্ষতি করতে পারেন না। একথা বলে তার চাচাত ভাই, ঐ যুগের ঈসায়ী ধর্মের আলেম এবং হিব্রু ভাষার পন্ডিত ব্যক্তি ওরাকা ইবনে নওফালের নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি নবীজীকে বলে দিলেন যিনি তোমার কাছে এসেছিলেন তিনি মুসা (আঃ) এর কাছেও ওহী নিয়ে আসতেন। তুমি ওহী প্রাপ্ত হয়েছ। এ ধরনের ওহি প্রাপ্ত যাহারা হন তাহারা স্বজাতী কর্তৃক শত্রু হয়ে যায়। তাকে মাতৃভূমি থেকে বের করে দেয়। যদি সেদিন পর্যন্ত আমি বেচে থাকি তবে আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব। দ্বিতীয় ওহী সুরা মোজ্জাম্মিলের প্রথম ৬ আয়াত এবং তৃতীয় ওহী আসে সুরা মোদ্দাসসির এর প্রথম ৬ আয়াত। এভাবে সুরা আলাক্ব মোজ্জাম্মিল ও মোদ্দাসির এই তিনটি সুরার কিছু অংশ নাযিল হয়। সুরা আল ফাতিহার পূর্বে আর কোন পুর্ণাঙ্গ সুরা নাযিল হয় নাই। তাই চতুর্থ ওহী সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ সুরা হিসাবে নাযিল হয় সুরা আল ফাতিহা। এমনি ভাবে একের পর এক হযরত জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে ওহী প্রেরণের দ্বারা পবিত্র- কোরআন শরীফ এই বিশ্বভ্রমান্ডের সমস্ত সৃষ্টিকুলের রাহাবা হিসাবে রহমাতুল্লিল আল আমিনের নিকট আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করেন। আর পবিত্র কালামে পাকের শেষ কথা, অর্থাৎ নাযিলকৃত শেষ ওহী “সুরা আল বাকারার ২৮১ নং আয়াতে- যার অর্থ “সে দিনকে ভয় কর যে দিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে এবং সুরা আল মায়দায় ৩ নং আয়াতের শেষের দিকে- যার অর্থ “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পুরিপূর্ণ করে দিলাম।” সর্বমোট ২২ বছর ৫ মাস ব্যাপী এই পবিত্র কালামে পাককে নাযিল করেছেন। আর এই পবিত্র গ্রন্থটি আল্লাহ পাক তার হাবিবের নিকট পাঠালেন- যার সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেন- “ওমা আরসালনা ইল্লা রহমাতাল্লিল আল আমিন” অর্থ আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।
(সূত্র: লন্ডনস্থ আল কোরআন একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত কোরআন শরীফ এবং বিশ্ব নবীর জীবন ইতিহাস)



















