বাংলাদেশ ১২:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Insaf World Banner

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০২

লেখক: ইমরান হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৫:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫
  • / 77

ছবি: সোপান

Insaf World Banner
"ইনসাফ বিশ্ব" পত্রিকার নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

(পর্ব ০২): দলিল অনুসন্ধানে হৃদয় ও সহমর্মিতার শক্তি

প্রথম পর্বের সেই তীব্র সংঘাতের পর হৃদয়কে আর শান্তিতে থাকতে দেয়নি স্কুলের জমি দখলের বিষয়টি। সে বুঝতে পারে, তার এই দেশপ্রেমের যাত্রা নিছক আবেগের বশে হতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং তথ্য। আল্লাহর প্রকৃত গোলাম হওয়ার প্রথম শর্তই হলো অলসতা ত্যাগ করে সত্যের অনুসন্ধানে নেমে পড়া। সে দিনের বেলা বই নিয়ে বসার বদলে স্থানীয় ভূমি অফিসের দিকে মন দেয়, যা তার পড়ালেখার বাইরে এক নতুন ‘পাঠশালা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ভূমি অফিসের কাজ ছিল হৃদয়ের কাছে এক বিশাল ধাঁধার মতো। এত কাগজ, এত ফাইল, আর এত নিয়ম! সে দেখে, সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা কঠিন। তবে তার মনকে দৃঢ় করে তার অহংকারহীন সফলতা। সে উপলব্ধি করে, আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান ও ধৈর্য দিয়েছেন, তা এই ধরনের জটিলতা সমাধানের জন্যই। হৃদয় ভূমি অফিসের সবচেয়ে বয়স্ক করণিক, আব্দুল মিয়ার কাছে যায়—যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, কিন্তু ক্ষমতার কাছে অসহায়।

আব্দুল মিয়া শুরুতে কিশোর হৃদয়ের এই আগ্রহকে ছেলেমানুষী মনে করেন। কিন্তু হৃদয়ের চোখ, যেখানে কোনো লোভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের চিহ্ন নেই, কেবল ন্যায় প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—তা দেখে তিনি অবাক হন। হৃদয় তাকে বোঝায়, এই স্কুল শুধু কিছু ইট-কাঠের কাঠামো নয়, এটি শত শত শিশুর ভবিষ্যতের সোপান। হৃদয় তার নম্রতা, দায়িত্ববোধ ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে আব্দুল মিয়ার মন জয় করে ফেলে। আব্দুল মিয়া বুঝতে পারেন, এই কিশোরের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহৎ উদ্দেশ্য।

আব্দুল মিয়া হৃদয়কে গোপনে পরামর্শ দেন যে, জমিটির মূল ‘খতিয়ান’ খুঁজতে হবে যা ৩০ বছর আগের। এটি ছিল যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলোর সন্ধান। হৃদয় তার বন্ধু শফিক, যে কিনা একটু লাজুক কিন্তু অত্যন্ত অনুগত, তাকে সঙ্গে নেয়। তারা দুজনে মিলে দিনের পর দিন পুরোনো ফাইল ঘাঁটা শুরু করে। এই কাজে তাদের কঠোর অধ্যবসায় ও কর্তব্যে নিষ্ঠা প্রকাশ পায়। তারা জানে, যদি তারা সফল হয়, তবে তা হবে শুধু তাদের নয়, বরং পুরো গ্রামের বিজয়।

এই কঠিন অনুসন্ধানের মাঝে হৃদয়ের সঙ্গে আরও একটি অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক তৈরি হয়। তানিয়া, যে একই অফিসের পাশে তার চাচার দোকানে কাজ করত, সে দূর থেকে হৃদয় ও শফিকের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে। তানিয়া খুব কম কথা বলত, কিন্তু হৃদয়ের দৃঢ়তা ও লক্ষ্যে অবিচলতা তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। এই নিঃস্বার্থ কাজের প্রতি তার আকর্ষণ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে হৃদয়ের প্রতি এক নীরব ভালোলাগায় পরিণত হয়। হৃদয় বরাবরের মতোই এই নীরব ভালোবাসার কোনো আঁচও পায় না, কারণ তার পুরো মনজুড়ে তখন শুধু স্কুল বাঁচানোর পরিকল্পনা।

একটি দুপুর, যখন প্রচণ্ড গরমে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল, হৃদয় একটি হলুদ হয়ে যাওয়া ফাইল খুঁজে পায়। সেখানেই ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত ‘খতিয়ান’। দলিলটিতে স্পষ্ট লেখা আছে যে, জমিটি এলাকার সাধারণ মানুষের দানের মাধ্যমে স্কুল নির্মাণের জন্য ওয়াক্ফ করা হয়েছিল। হৃদয় বুঝতে পারে, এটি শুধু একটি কাগজে লেখা তথ্য নয়, এটি হলো সত্যের জয় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মিথ্যা দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

দলিল পাওয়ার পর হৃদয় প্রথমে গিয়েছিল রমিজ চাচার কাছে। বৃদ্ধ শিক্ষক সেই কাগজ বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন। তিনি হৃদয়কে জড়িয়ে ধরে বলেন, “হৃদয়, তুমি শুধু জমি বাঁচাওনি, তুমি প্রমাণ করেছো, সততার শক্তি সব অসৎ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।” হৃদয়ের চোখও ছলছল করে ওঠে, তবে সে অহংকারী হয় না, বরং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তার এই উপলব্ধি তাকে আরও বিনয়ী করে তোলে।

হৃদয়ের এই সাফল্যের খবর দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা এতদিন ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারত না, তারা হৃদয়কে দেখতে আসে। তারা হৃদয়ের সাহস ও দৃঢ়তাকে সম্মান জানায়। এই ঘটনা হৃদয়কে শিখিয়ে দেয় যে, একটি জাতির সত্যিকারের শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ মানুষের ঐক্য ও সংহতির মধ্যে। তার দেশপ্রেম এখন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জন-আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

হৃদয় তার বন্ধু শফিককে নিয়ে শহরের একটি ফটোকপির দোকানে যায়। সেখানে সে দলিলটির বহু কপি করে রাখে। তার মনে কোনো প্রতিশোধের ভাবনা ছিল না, ছিল কেবল ন্যায়ের পথে চলার মানসিকতা। সে জানে, এই অন্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে হবে শান্তির মাধ্যমে, আইনের মাধ্যমে। সে তার কাজের মাধ্যমে সমাজের প্রতি নিজের গভীর দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এইভাবেই কিশোর হৃদয় তার প্রথম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একধাপ এগিয়ে যায়। হাতে দলিল, হৃদয়ে আল্লাহর উপর আস্থা এবং মনে দেশের প্রতি অঙ্গীকার। স্কুল বাঁচাতে তার এই নিরলস প্রয়াস তাকে কেবল একজন ছাত্র হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের একজন আদর্শ স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে গড়ে তোলার পথে প্রথম বড় ‘সোপান’ হিসেবে কাজ করে। তার নীরব উপাখ্যান এখন স্থানীয় মানুষের মনে আশার আলো ছড়াতে শুরু করেছে।

চলবে………

সংবাদটি শেয়ার করুন :
Insaf World Banner 1
Insaf World Banner 2

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০২

আপডেট সময় : ০৭:৪৫:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫

(পর্ব ০২): দলিল অনুসন্ধানে হৃদয় ও সহমর্মিতার শক্তি

প্রথম পর্বের সেই তীব্র সংঘাতের পর হৃদয়কে আর শান্তিতে থাকতে দেয়নি স্কুলের জমি দখলের বিষয়টি। সে বুঝতে পারে, তার এই দেশপ্রেমের যাত্রা নিছক আবেগের বশে হতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং তথ্য। আল্লাহর প্রকৃত গোলাম হওয়ার প্রথম শর্তই হলো অলসতা ত্যাগ করে সত্যের অনুসন্ধানে নেমে পড়া। সে দিনের বেলা বই নিয়ে বসার বদলে স্থানীয় ভূমি অফিসের দিকে মন দেয়, যা তার পড়ালেখার বাইরে এক নতুন ‘পাঠশালা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ভূমি অফিসের কাজ ছিল হৃদয়ের কাছে এক বিশাল ধাঁধার মতো। এত কাগজ, এত ফাইল, আর এত নিয়ম! সে দেখে, সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কতটা কঠিন। তবে তার মনকে দৃঢ় করে তার অহংকারহীন সফলতা। সে উপলব্ধি করে, আল্লাহ তাকে যে জ্ঞান ও ধৈর্য দিয়েছেন, তা এই ধরনের জটিলতা সমাধানের জন্যই। হৃদয় ভূমি অফিসের সবচেয়ে বয়স্ক করণিক, আব্দুল মিয়ার কাছে যায়—যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, কিন্তু ক্ষমতার কাছে অসহায়।

আব্দুল মিয়া শুরুতে কিশোর হৃদয়ের এই আগ্রহকে ছেলেমানুষী মনে করেন। কিন্তু হৃদয়ের চোখ, যেখানে কোনো লোভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের চিহ্ন নেই, কেবল ন্যায় প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—তা দেখে তিনি অবাক হন। হৃদয় তাকে বোঝায়, এই স্কুল শুধু কিছু ইট-কাঠের কাঠামো নয়, এটি শত শত শিশুর ভবিষ্যতের সোপান। হৃদয় তার নম্রতা, দায়িত্ববোধ ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে আব্দুল মিয়ার মন জয় করে ফেলে। আব্দুল মিয়া বুঝতে পারেন, এই কিশোরের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহৎ উদ্দেশ্য।

আব্দুল মিয়া হৃদয়কে গোপনে পরামর্শ দেন যে, জমিটির মূল ‘খতিয়ান’ খুঁজতে হবে যা ৩০ বছর আগের। এটি ছিল যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে আলোর সন্ধান। হৃদয় তার বন্ধু শফিক, যে কিনা একটু লাজুক কিন্তু অত্যন্ত অনুগত, তাকে সঙ্গে নেয়। তারা দুজনে মিলে দিনের পর দিন পুরোনো ফাইল ঘাঁটা শুরু করে। এই কাজে তাদের কঠোর অধ্যবসায় ও কর্তব্যে নিষ্ঠা প্রকাশ পায়। তারা জানে, যদি তারা সফল হয়, তবে তা হবে শুধু তাদের নয়, বরং পুরো গ্রামের বিজয়।

এই কঠিন অনুসন্ধানের মাঝে হৃদয়ের সঙ্গে আরও একটি অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক তৈরি হয়। তানিয়া, যে একই অফিসের পাশে তার চাচার দোকানে কাজ করত, সে দূর থেকে হৃদয় ও শফিকের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে। তানিয়া খুব কম কথা বলত, কিন্তু হৃদয়ের দৃঢ়তা ও লক্ষ্যে অবিচলতা তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। এই নিঃস্বার্থ কাজের প্রতি তার আকর্ষণ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে হৃদয়ের প্রতি এক নীরব ভালোলাগায় পরিণত হয়। হৃদয় বরাবরের মতোই এই নীরব ভালোবাসার কোনো আঁচও পায় না, কারণ তার পুরো মনজুড়ে তখন শুধু স্কুল বাঁচানোর পরিকল্পনা।

একটি দুপুর, যখন প্রচণ্ড গরমে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল, হৃদয় একটি হলুদ হয়ে যাওয়া ফাইল খুঁজে পায়। সেখানেই ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত ‘খতিয়ান’। দলিলটিতে স্পষ্ট লেখা আছে যে, জমিটি এলাকার সাধারণ মানুষের দানের মাধ্যমে স্কুল নির্মাণের জন্য ওয়াক্ফ করা হয়েছিল। হৃদয় বুঝতে পারে, এটি শুধু একটি কাগজে লেখা তথ্য নয়, এটি হলো সত্যের জয় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মিথ্যা দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

দলিল পাওয়ার পর হৃদয় প্রথমে গিয়েছিল রমিজ চাচার কাছে। বৃদ্ধ শিক্ষক সেই কাগজ বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন। তিনি হৃদয়কে জড়িয়ে ধরে বলেন, “হৃদয়, তুমি শুধু জমি বাঁচাওনি, তুমি প্রমাণ করেছো, সততার শক্তি সব অসৎ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।” হৃদয়ের চোখও ছলছল করে ওঠে, তবে সে অহংকারী হয় না, বরং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তার এই উপলব্ধি তাকে আরও বিনয়ী করে তোলে।

হৃদয়ের এই সাফল্যের খবর দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা এতদিন ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারত না, তারা হৃদয়কে দেখতে আসে। তারা হৃদয়ের সাহস ও দৃঢ়তাকে সম্মান জানায়। এই ঘটনা হৃদয়কে শিখিয়ে দেয় যে, একটি জাতির সত্যিকারের শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ মানুষের ঐক্য ও সংহতির মধ্যে। তার দেশপ্রেম এখন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জন-আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

হৃদয় তার বন্ধু শফিককে নিয়ে শহরের একটি ফটোকপির দোকানে যায়। সেখানে সে দলিলটির বহু কপি করে রাখে। তার মনে কোনো প্রতিশোধের ভাবনা ছিল না, ছিল কেবল ন্যায়ের পথে চলার মানসিকতা। সে জানে, এই অন্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে হবে শান্তির মাধ্যমে, আইনের মাধ্যমে। সে তার কাজের মাধ্যমে সমাজের প্রতি নিজের গভীর দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এইভাবেই কিশোর হৃদয় তার প্রথম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একধাপ এগিয়ে যায়। হাতে দলিল, হৃদয়ে আল্লাহর উপর আস্থা এবং মনে দেশের প্রতি অঙ্গীকার। স্কুল বাঁচাতে তার এই নিরলস প্রয়াস তাকে কেবল একজন ছাত্র হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের একজন আদর্শ স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে গড়ে তোলার পথে প্রথম বড় ‘সোপান’ হিসেবে কাজ করে। তার নীরব উপাখ্যান এখন স্থানীয় মানুষের মনে আশার আলো ছড়াতে শুরু করেছে।

চলবে………

সংবাদটি শেয়ার করুন :