বাংলাদেশ ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Insaf World Banner

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০৬

লেখক: ইমরান হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৩:৫৪:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫
  • / 88

ছবি: সোপান

Insaf World Banner
"ইনসাফ বিশ্ব" পত্রিকার নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

(পর্ব ০৬ : প্রযুক্তির পাঠ ও একটি নীরব সংগঠন)

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর হৃদয় শুধু ক্লাসরুমের পড়ালেখাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তার কাছে প্রতিটি যন্ত্র বা প্রযুক্তি ছিল দেশের মানুষের জীবন সহজ করার একটি মাধ্যম। তার স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন তাকে সর্বদা উৎসাহিত করত নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে। সে তার জীবনের প্রতিটি জ্ঞানার্জনের মুহূর্তকে মহান আল্লাহ্‌র একজন প্রকৃত গোলামের কর্তব্য হিসেবে দেখত, যা তাকে অহংকারী না করে বরং আরও গভীরভাবে জ্ঞানার্জনে মনোযোগী করত।

হৃদয় এবং তার বন্ধু শফিক মিলে একটি ছোট, নীরব সংগঠন তৈরি করে—যার নাম দেওয়া হয় ‘দেশের জন্য সোপান’। এই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল কোনো আনুষ্ঠানিক পদ বা খ্যাতি অর্জন করা নয়, বরং প্রকৌশল জ্ঞান ব্যবহার করে সমাজের ছোটখাটো সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা। তারা প্রায়ই গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্প খরচের প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে গবেষণা করত, যেমন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সহজ পদ্ধতি বা গ্রামীণ রাস্তা মেরামতের স্থানীয় কৌশল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে, হৃদয়ের এই নিঃস্বার্থ কাজগুলো খুব দ্রুতই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জুঁই নামের একজন সিনিয়র ছাত্রী, যিনি পরিবেশ প্রকৌশল নিয়ে পড়তেন, তিনি হৃদয়ের কাজে গভীরভাবে মুগ্ধ হন। জুঁই হৃদয়ের এই নীরব দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা না চাওয়ার মানসিকতা দেখে প্রথমবার তাঁর প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। তিনি বুঝতে পারেন, হৃদয় অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; তার লক্ষ্য শুধু নিজের উন্নতি নয়, বরং দেশের সমৃদ্ধি।

জুঁই একদিন সাহস করে হৃদয়ের সামনে আসেন এবং তাঁর সংগঠনের কাজে সহায়তা করার প্রস্তাব দেন। হৃদয় অত্যন্ত বিনয়ী এবং নিরপেক্ষভাবে জুঁইকে স্বাগত জানায়, তবে শর্ত দেয় যে এই কাজ হতে হবে সম্পূর্ণ সেবামূলক এবং এর সঙ্গে যেন কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অনুরাগ যুক্ত না হয়। হৃদয়ের এই নির্মোহ আচরণ জুঁইকে একদিকে যেমন আকর্ষণ করে, অন্যদিকে তেমনই তার প্রতি এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে—কিন্তু জুঁই তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ না পেয়ে হৃদয়ের নীরব কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

হৃদয় এই সময় তার জ্ঞানকে আরও শাণিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিত। সে বুঝতে পারে, দেশপ্রেমের জন্য শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার। তার মধ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, যা তাকে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে অনুপ্রাণিত করত। এই পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ অস্থির। ছাত্ররা প্রায়শই ক্ষমতার জন্য বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতো। কিন্তু হৃদয় এবং তার ‘দেশের জন্য সোপান’ সংগঠনটি এই সব থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিল। হৃদয় বিশ্বাস করত, তার আসল দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য কাজ করা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য নয়। তার এই নৈতিকতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

এক সেমিস্টারে তাদের একটি কঠিন দলীয় প্রকল্প দেওয়া হয়—একটি বন্যা-কবলিত অঞ্চলের জন্য স্বল্প খরচে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরি করা। অন্য দলগুলো যখন দ্রুত এবং গতানুগতিক সমাধান নিয়ে আসে, হৃদয় তখন তার ‘স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী’ মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করে। সে স্থানীয় উপকরণ, জলবায়ু এবং ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন মডেল তৈরি করে, যা ছিল অত্যন্ত টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব।

এই প্রকল্পে হৃদয়ের উদ্যোগ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং অতুলনীয় কর্তব্যে নিষ্ঠা প্রকাশ পায়। তার এই উদ্ভাবনী সমাধান কেবল শিক্ষকদের মুগ্ধ করে না, বরং দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই মডেল প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করে। এই সফলতা হৃদয়কে আরও বেশি নম্র করে তোলে; সে আবারও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়—যে আল্লাহ্‌ তাঁকে এই জ্ঞান ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন।

তার এই প্রজেক্টের সাফল্যের খবর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শহরের বিদ্বৎ সমাজে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তাঁর এই উদ্ভাবন নিয়ে ছোট করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এইভাবে হৃদয় তার ১৮ বছর বয়সে প্রথম আনুষ্ঠানিক খ্যাতি অর্জন করে, যা তার দেশব্যাপী পরিচিতির পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে। এই খ্যাতি তার অহংকারকে একটুও স্পর্শ করেনি; বরং সে একে দেশের প্রতি তার দায়িত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে।

এভাবেই হৃদয়ের নীরব উপাখ্যান চলতে থাকে। সে জ্ঞানের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে, নৈতিকতার মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ রাখে এবং নারীর প্রেমময় আহ্বান থেকে দূরে থেকে দেশের কল্যাণে মনোযোগী হয়। তার লক্ষ্য স্পষ্ট: নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে ৪০ বছর বয়সে সে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। এই পর্বটি ছিল সেই লক্ষ্যের দিকে তার আরও একটি দৃঢ় সোপান।


চলবে……

সংবাদটি শেয়ার করুন :
Insaf World Banner 1
Insaf World Banner 2

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০৬

আপডেট সময় : ০৩:৫৪:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

(পর্ব ০৬ : প্রযুক্তির পাঠ ও একটি নীরব সংগঠন)

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর হৃদয় শুধু ক্লাসরুমের পড়ালেখাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তার কাছে প্রতিটি যন্ত্র বা প্রযুক্তি ছিল দেশের মানুষের জীবন সহজ করার একটি মাধ্যম। তার স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন তাকে সর্বদা উৎসাহিত করত নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে। সে তার জীবনের প্রতিটি জ্ঞানার্জনের মুহূর্তকে মহান আল্লাহ্‌র একজন প্রকৃত গোলামের কর্তব্য হিসেবে দেখত, যা তাকে অহংকারী না করে বরং আরও গভীরভাবে জ্ঞানার্জনে মনোযোগী করত।

হৃদয় এবং তার বন্ধু শফিক মিলে একটি ছোট, নীরব সংগঠন তৈরি করে—যার নাম দেওয়া হয় ‘দেশের জন্য সোপান’। এই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল কোনো আনুষ্ঠানিক পদ বা খ্যাতি অর্জন করা নয়, বরং প্রকৌশল জ্ঞান ব্যবহার করে সমাজের ছোটখাটো সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা। তারা প্রায়ই গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্প খরচের প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে গবেষণা করত, যেমন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সহজ পদ্ধতি বা গ্রামীণ রাস্তা মেরামতের স্থানীয় কৌশল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে, হৃদয়ের এই নিঃস্বার্থ কাজগুলো খুব দ্রুতই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জুঁই নামের একজন সিনিয়র ছাত্রী, যিনি পরিবেশ প্রকৌশল নিয়ে পড়তেন, তিনি হৃদয়ের কাজে গভীরভাবে মুগ্ধ হন। জুঁই হৃদয়ের এই নীরব দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা না চাওয়ার মানসিকতা দেখে প্রথমবার তাঁর প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। তিনি বুঝতে পারেন, হৃদয় অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; তার লক্ষ্য শুধু নিজের উন্নতি নয়, বরং দেশের সমৃদ্ধি।

জুঁই একদিন সাহস করে হৃদয়ের সামনে আসেন এবং তাঁর সংগঠনের কাজে সহায়তা করার প্রস্তাব দেন। হৃদয় অত্যন্ত বিনয়ী এবং নিরপেক্ষভাবে জুঁইকে স্বাগত জানায়, তবে শর্ত দেয় যে এই কাজ হতে হবে সম্পূর্ণ সেবামূলক এবং এর সঙ্গে যেন কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অনুরাগ যুক্ত না হয়। হৃদয়ের এই নির্মোহ আচরণ জুঁইকে একদিকে যেমন আকর্ষণ করে, অন্যদিকে তেমনই তার প্রতি এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে—কিন্তু জুঁই তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ না পেয়ে হৃদয়ের নীরব কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

হৃদয় এই সময় তার জ্ঞানকে আরও শাণিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিত। সে বুঝতে পারে, দেশপ্রেমের জন্য শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার। তার মধ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, যা তাকে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে অনুপ্রাণিত করত। এই পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ অস্থির। ছাত্ররা প্রায়শই ক্ষমতার জন্য বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতো। কিন্তু হৃদয় এবং তার ‘দেশের জন্য সোপান’ সংগঠনটি এই সব থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিল। হৃদয় বিশ্বাস করত, তার আসল দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য কাজ করা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য নয়। তার এই নৈতিকতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

এক সেমিস্টারে তাদের একটি কঠিন দলীয় প্রকল্প দেওয়া হয়—একটি বন্যা-কবলিত অঞ্চলের জন্য স্বল্প খরচে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরি করা। অন্য দলগুলো যখন দ্রুত এবং গতানুগতিক সমাধান নিয়ে আসে, হৃদয় তখন তার ‘স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী’ মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করে। সে স্থানীয় উপকরণ, জলবায়ু এবং ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন মডেল তৈরি করে, যা ছিল অত্যন্ত টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব।

এই প্রকল্পে হৃদয়ের উদ্যোগ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং অতুলনীয় কর্তব্যে নিষ্ঠা প্রকাশ পায়। তার এই উদ্ভাবনী সমাধান কেবল শিক্ষকদের মুগ্ধ করে না, বরং দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই মডেল প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করে। এই সফলতা হৃদয়কে আরও বেশি নম্র করে তোলে; সে আবারও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়—যে আল্লাহ্‌ তাঁকে এই জ্ঞান ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন।

তার এই প্রজেক্টের সাফল্যের খবর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শহরের বিদ্বৎ সমাজে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তাঁর এই উদ্ভাবন নিয়ে ছোট করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এইভাবে হৃদয় তার ১৮ বছর বয়সে প্রথম আনুষ্ঠানিক খ্যাতি অর্জন করে, যা তার দেশব্যাপী পরিচিতির পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে। এই খ্যাতি তার অহংকারকে একটুও স্পর্শ করেনি; বরং সে একে দেশের প্রতি তার দায়িত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে।

এভাবেই হৃদয়ের নীরব উপাখ্যান চলতে থাকে। সে জ্ঞানের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে, নৈতিকতার মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ রাখে এবং নারীর প্রেমময় আহ্বান থেকে দূরে থেকে দেশের কল্যাণে মনোযোগী হয়। তার লক্ষ্য স্পষ্ট: নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে ৪০ বছর বয়সে সে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। এই পর্বটি ছিল সেই লক্ষ্যের দিকে তার আরও একটি দৃঢ় সোপান।


চলবে……

সংবাদটি শেয়ার করুন :