সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০৫
- আপডেট সময় : ০১:৫৮:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫
- / 72
(পর্ব ০৫: শহরে প্রবেশ ও কঠোর অধ্যবসায়)
হৃদয়ের জন্য উচ্চশিক্ষা অর্জন ছিল নিছক কোনো সার্টিফিকেট লাভের মাধ্যম নয়, বরং দেশের জন্য আরও বড় কিছু করার একটি সোপান। সে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কঠোর প্রস্তুতি শুরু করে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার এই সিদ্ধান্ত তার জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু তার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সে জানত, উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তি আয়ত্ত না করতে পারলে স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হিসেবে দেশের কল্যাণে সেভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না। এই সময় হৃদয়ের জীবনের মূল মন্ত্র ছিল — মহান আল্লাহ্র একজন প্রকৃত গোলামের কর্তব্য হলো নিজেকে সর্বোত্তম উপায়ে প্রস্তুত করা।
শহরের জীবনযাত্রা গ্রামের শান্ত পরিবেশের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোলাহল, ব্যস্ততা এবং নানা ধরনের প্রলোভন। কিন্তু হৃদয়ের মন ছিল তার লক্ষ্যে স্থির। সে শহরের একটি সাধারণ মেসে থাকতে শুরু করে, যেখানে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল বই এবং তার দৃঢ় সংকল্প। সে দিনের বেশিরভাগ সময় লাইব্রেরিতে কাটাত, পড়ালেখায় তার কর্তব্যে নিষ্ঠা ছিল দেখার মতো। সে কখনোই নিজের ব্যক্তিগত আরাম বা বিনোদনের জন্য সময় নষ্ট করত না। তার কাছে, দেশের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মানেই হলো প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। হৃদয় তার প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও অধ্যবসায় দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। সে কোনো কোচিং সেন্টারে যায়নি, বরং নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের উপর ভরসা রেখেছিল। তার অহংকারহীন সফলতা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, ফল যাই আসুক না কেন, প্রচেষ্টা যেন সর্বশ্রেষ্ঠ হয়। পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, হৃদয় মেধা তালিকায় প্রথম সারিতে স্থান করে নিয়েছে। এই ফলাফলে তার গ্রামে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, কিন্তু হৃদয় থাকে শান্ত ও বিনয়ী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া চলাকালীন, হৃদয়ের সঙ্গে মায়া নামের মেয়েটির আবারও দেখা হয়। মায়া শহরের একটি কলেজে পড়ালেখা করত এবং হৃদয়ের সাফল্যের খবর পেয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিল। মায়ার চোখে হৃদয়ের প্রতি ছিল এক ধরনের নীরব admiration, যা হৃদয়ের চরিত্র, তার সততা এবং নম্রতার ফল। মায়া হৃদয়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে চাইলেও হৃদয় অত্যন্ত বিনম্রভাবে তা এড়িয়ে যায়। তার সহানুভূতি ও মানবিকতা ছিল সমাজের জন্য, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাঁধনে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা তার ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার পর হৃদয়ের জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে, তার প্রকৌশল জ্ঞানকে কীভাবে পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। সে ক্লাসের সবচেয়ে মনোযোগী এবং অনুসন্ধিৎসু ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তার লক্ষ্য ছিল প্রকৌশল বিদ্যার গভীরে প্রবেশ করা, যাতে সে ভবিষ্যতে তার স্বপ্নের স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক হিসেবে দেশের নানা প্রান্তে সঠিক সমাধান পৌঁছে দিতে পারে।
এই সময়ে তার প্রথম বন্ধুত্ব হয় শফিক নামে এক সহপাঠীর সাথে, যে ছিল তার গ্রামের মতোই সহজ-সরল এবং একই আদর্শে বিশ্বাসী। শফিকের সঙ্গে মিলে হৃদয় একটি ছোট গবেষণা দল তৈরি করে, যেখানে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার। এই গবেষণা দল তাদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের মাঝামাঝি সময়ে, সোনালী নামের একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী হৃদয়ের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সোনালীও প্রকৌশল বিষয়ে গভীর আগ্রহী ছিল এবং হৃদয়ের গবেষণার পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের প্রতি তার শ্রদ্ধা জন্মায়। সোনালী হৃদয়কে বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজে সাহায্য করার প্রস্তাব দেয়, যা ধীরে ধীরে তার মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। হৃদয় তার মনোযোগ পুরোপুরি গবেষণায় নিবদ্ধ রাখে, নারীর কাছ থেকে আসা এই নীরব ভালোবাসার আভাস থেকেও সে সচেতনভাবে দূরে থাকে।
হৃদয় এই নতুন পরিবেশে তার চারপাশের দেশপ্রেমের অভাব দেখে মাঝে মাঝে হতাশ হয়, কিন্তু তার ইতিবাচক মানসিকতা তাকে ভেঙে পড়তে দেয় না। সে নিজেকে মনে করিয়ে দেয়, তার কাজ হলো নিজে আদর্শ হওয়া এবং অন্যদের নীরবে অনুপ্রাণিত করা। তার নীরব উপাখ্যান তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে শুরু হয়, যেখানে সবাই দ্রুত সফল হতে চায়, আর সে চায় সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে দেশের সেবা করতে।
রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, হৃদয় তখন তার ডায়েরিতে লিখত—তার দেশপ্রেম শুধু দেশের মাটির প্রতি নয়, বরং দেশের মানুষের প্রতি, দেশের আইনের প্রতি এবং আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ জীবনবিধানের প্রতি। তার জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সফলতা ছিল এই মূলনীতির প্রতিফলন। সে নিজেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, যেন কোনো সফলতা তাকে অহংকারী না করে তোলে।
এভাবেই হৃদয়ের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সের এই সময়টি কাটে কঠোর অধ্যবসায় ও প্রস্তুতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পর্বটি ছিল তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। সে তার প্রথম আঞ্চলিক পরিচিতি থেকে এখন জাতীয় স্তরের মেধার লড়াইয়ে প্রবেশ করেছে, যা তাকে ভবিষ্যতের স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হিসেবে দেশের প্রায় সকল অঞ্চলে পরিচিতি লাভের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।





























