বাংলাদেশ ১২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Insaf World Banner

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০৪

লেখক: ইমরান হোসেন
  • আপডেট সময় : ০৮:২৫:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / 78

ছবি : সোপান

Insaf World Banner
"ইনসাফ বিশ্ব" পত্রিকার নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

(পর্ব ০৪ : স্বপ্ন এবং এক নতুন গন্তব্য)

স্কুলের জমি রক্ষার সেই প্রথম বিজয় হৃদয়কে আত্মতুষ্টির বদলে এক গভীর নীরব দায়িত্ববোধে আবদ্ধ করে। সে বুঝতে পারে, তার এই সফলতা ছিল মহান আল্লাহ্‌র একটি অনুগ্রহ, যার বিনিময়ে তাকে সমাজের জন্য আরও বড় কাজ করতে হবে। হৃদয় তার প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে মনোযোগ দেয়। এই বয়সে এসেও সে তার ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়ে দেশের জন্য অবদান রাখার তাগিদকে অগ্রাধিকার দিত। তার মনে তখন দেশপ্রেম কেবল একটি আদর্শ নয়, বরং প্রতিদিনের কাজের প্রেরণা।

হৃদয়ের জীবনের সেই পর্যায়টি ছিল প্রস্তুতি ও আত্মসমীক্ষার। সে নিয়মিতভাবে নিজের পড়ালেখার বাইরেও প্রকৌশলগত বিভিন্ন বই পড়তে শুরু করে। সে দেখতে থাকে কীভাবে উন্নত দেশগুলো তাদের স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করে স্বল্প খরচে অবকাঠামো তৈরি করছে। হৃদয় অনুভব করে, এই দেশের মানুষের জন্য স্থিতিশীল ও টেকসই সমাধান প্রয়োজন, যা কেবল চাকরিনির্ভর জীবন থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তার স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন এখান থেকেই দৃঢ় হতে থাকে।

এই সময়, স্থানীয় মাদ্রাসার একজন শিক্ষক, যিনি হৃদয়কে দূর থেকে লক্ষ্য করতেন, তিনি তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। শিক্ষক বলেন, “হৃদয়, তোমার জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে ব্যয় করাই প্রকৃত ইবাদত। কিন্তু মনে রেখো, গোলামের জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত হলো ধৈর্য (সবর)কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া)। দ্রুত খ্যাতি অর্জনের চেয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করো।” এই কথা হৃদয়ের মনে গভীর রেখা টানে। সে আরও বিনয়ী হয় এবং তার অহংকারকে শূন্যের কোঠায় রাখে।

হৃদয়ের সেই মামলার খবর তখন আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার পরিচিতির পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। বহু মানুষ তাদের নিজেদের ছোটখাটো আইনি বা সামাজিক সমস্যার সমাধানে তার পরামর্শ নিতে আসত। হৃদয় তখন কেবল একজন কিশোর ছাত্র নয়, সে যেন সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায় বিচারের একটি প্রতীক। সে তার এই ক্রমবর্ধমান পরিচিতিকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎস হিসেবে না দেখে, দেখে বৃহত্তর সমাজের প্রতি তার অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে।

একদিন, দূরবর্তী এক শহর থেকে একটি শিক্ষামূলক সেমিনারের আমন্ত্রণ আসে হৃদয়ের কাছে। সেখানে মূলত তরুণ প্রকৌশলী ও সমাজকর্মীরা উপস্থিত হবেন। এই আমন্ত্রণ ছিল তার কাছে একটি নতুন ‘সোপান’, একটি নতুন গন্তব্যের হাতছানি। হৃদয় তার বাবার অনুমতি নিয়ে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে প্রথমবার তার পরিচিত আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক বৃহত্তর মঞ্চের দিকে যাত্রা করে। এটি ছিল একজন নিবেদিত দেশপ্রেমিকের জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।

শহরে যাওয়ার পথে বাসস্ট্যান্ডে তার সঙ্গে ঐশী নামের একটি মেয়ের দেখা হয়। ঐশী ছিল একজন স্বাধীনচেতা, সমাজ সচেতন ছাত্রী। সে হৃদয়ের সেই মামলার কথা শুনেছিল এবং হৃদয়ের চারিত্রিক দৃঢ়তায় মুগ্ধ ছিল। বাসস্ট্যান্ডে সামান্য অপেক্ষার মুহূর্তে ঐশী হৃদয়কে সাহস জুগিয়ে কিছু কথা বলতে চায়, কিন্তু হৃদয়ের চোখ-মুখের সেই গাম্ভীর্য ও লক্ষ্যভেদী মনোযোগ দেখে সে পিছু হটে যায়। নারীর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ থেকে হৃদয় সব সময়ই দূরে থাকে, তার মনের পুরোটা জুড়ে তখন ছিল সেমিনার ও দেশের কল্যাণের চিন্তা।

সেমিনারে হৃদয় তার গ্রামের স্কুল রক্ষার অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করা যায়, সেই বিষয়ে অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে বক্তব্য রাখে। তার বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তার বক্তব্যে ছিল গভীর প্রজ্ঞা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি। সেমিনারে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়। তারা বুঝতে পারে, এই কিশোরের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের এক মহৎ নেতা, একজন নিবেদিত স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী।

সেমিনার শেষে সেখানকার একজন বয়স্ক ও প্রভাবশালী অধ্যাপক হৃদয়ের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। অধ্যাপক হৃদয়কে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার গুরুত্ব বোঝান এবং তাকে আশ্বাস দেন যে, তিনি তার ভর্তির জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করবেন। হৃদয় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই সুযোগ গ্রহণ করে। সে উপলব্ধি করে, এই অপ্রত্যাশিত সাহায্য তার কাজের প্রতি মহান আল্লাহ্‌র দেওয়া পুরস্কার।

হৃদয় যখন শাপলাডাঙ্গা গ্রামে ফেরে, সে আর কেবল স্কুলের ছেলে নয়। তার মধ্যে এসেছে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও অঙ্গীকার। তার মনে তখন বীজ বোনা হয়েছে এক মহান লক্ষ্যের—প্রকৌশলী হয়ে দেশকে সেবা করার, যার পূর্ণতা আসবে ৪০ বছর বয়সে। সে গ্রামের মানুষের কাছে যায়, যাদের সমর্থন তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, এবং তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

এইভাবে কিশোর হৃদয়ের জীবন এক নতুন দিকে মোড় নেয়। তার প্রথম বিজয় তাকে পরিচিতি এনে দিয়েছে, কিন্তু এই পরিচিতি তার চরিত্রে বিন্দুমাত্র অহংকার যোগ করেনি। বরং এটি তাকে তার স্বপ্নের পথে আরও বিনয়ী ও ধৈর্যশীল করে তুলেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য প্রস্তুত হওয়াটা ছিল তার নীরব উপাখ্যানের পরবর্তী সোপান—যা তাকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য, অর্থাৎ দেশের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য প্রস্তুত করবে।


চলবে…….

সংবাদটি শেয়ার করুন :
Insaf World Banner 1
Insaf World Banner 2

সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ০৪

আপডেট সময় : ০৮:২৫:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

(পর্ব ০৪ : স্বপ্ন এবং এক নতুন গন্তব্য)

স্কুলের জমি রক্ষার সেই প্রথম বিজয় হৃদয়কে আত্মতুষ্টির বদলে এক গভীর নীরব দায়িত্ববোধে আবদ্ধ করে। সে বুঝতে পারে, তার এই সফলতা ছিল মহান আল্লাহ্‌র একটি অনুগ্রহ, যার বিনিময়ে তাকে সমাজের জন্য আরও বড় কাজ করতে হবে। হৃদয় তার প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নের দিকে আরও দৃঢ়ভাবে মনোযোগ দেয়। এই বয়সে এসেও সে তার ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়ে দেশের জন্য অবদান রাখার তাগিদকে অগ্রাধিকার দিত। তার মনে তখন দেশপ্রেম কেবল একটি আদর্শ নয়, বরং প্রতিদিনের কাজের প্রেরণা।

হৃদয়ের জীবনের সেই পর্যায়টি ছিল প্রস্তুতি ও আত্মসমীক্ষার। সে নিয়মিতভাবে নিজের পড়ালেখার বাইরেও প্রকৌশলগত বিভিন্ন বই পড়তে শুরু করে। সে দেখতে থাকে কীভাবে উন্নত দেশগুলো তাদের স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করে স্বল্প খরচে অবকাঠামো তৈরি করছে। হৃদয় অনুভব করে, এই দেশের মানুষের জন্য স্থিতিশীল ও টেকসই সমাধান প্রয়োজন, যা কেবল চাকরিনির্ভর জীবন থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তার স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন এখান থেকেই দৃঢ় হতে থাকে।

এই সময়, স্থানীয় মাদ্রাসার একজন শিক্ষক, যিনি হৃদয়কে দূর থেকে লক্ষ্য করতেন, তিনি তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। শিক্ষক বলেন, “হৃদয়, তোমার জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে ব্যয় করাই প্রকৃত ইবাদত। কিন্তু মনে রেখো, গোলামের জীবনের সবচেয়ে বড় ইবাদত হলো ধৈর্য (সবর)কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া)। দ্রুত খ্যাতি অর্জনের চেয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করো।” এই কথা হৃদয়ের মনে গভীর রেখা টানে। সে আরও বিনয়ী হয় এবং তার অহংকারকে শূন্যের কোঠায় রাখে।

হৃদয়ের সেই মামলার খবর তখন আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার পরিচিতির পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। বহু মানুষ তাদের নিজেদের ছোটখাটো আইনি বা সামাজিক সমস্যার সমাধানে তার পরামর্শ নিতে আসত। হৃদয় তখন কেবল একজন কিশোর ছাত্র নয়, সে যেন সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায় বিচারের একটি প্রতীক। সে তার এই ক্রমবর্ধমান পরিচিতিকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎস হিসেবে না দেখে, দেখে বৃহত্তর সমাজের প্রতি তার অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে।

একদিন, দূরবর্তী এক শহর থেকে একটি শিক্ষামূলক সেমিনারের আমন্ত্রণ আসে হৃদয়ের কাছে। সেখানে মূলত তরুণ প্রকৌশলী ও সমাজকর্মীরা উপস্থিত হবেন। এই আমন্ত্রণ ছিল তার কাছে একটি নতুন ‘সোপান’, একটি নতুন গন্তব্যের হাতছানি। হৃদয় তার বাবার অনুমতি নিয়ে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে প্রথমবার তার পরিচিত আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক বৃহত্তর মঞ্চের দিকে যাত্রা করে। এটি ছিল একজন নিবেদিত দেশপ্রেমিকের জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।

শহরে যাওয়ার পথে বাসস্ট্যান্ডে তার সঙ্গে ঐশী নামের একটি মেয়ের দেখা হয়। ঐশী ছিল একজন স্বাধীনচেতা, সমাজ সচেতন ছাত্রী। সে হৃদয়ের সেই মামলার কথা শুনেছিল এবং হৃদয়ের চারিত্রিক দৃঢ়তায় মুগ্ধ ছিল। বাসস্ট্যান্ডে সামান্য অপেক্ষার মুহূর্তে ঐশী হৃদয়কে সাহস জুগিয়ে কিছু কথা বলতে চায়, কিন্তু হৃদয়ের চোখ-মুখের সেই গাম্ভীর্য ও লক্ষ্যভেদী মনোযোগ দেখে সে পিছু হটে যায়। নারীর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ থেকে হৃদয় সব সময়ই দূরে থাকে, তার মনের পুরোটা জুড়ে তখন ছিল সেমিনার ও দেশের কল্যাণের চিন্তা।

সেমিনারে হৃদয় তার গ্রামের স্কুল রক্ষার অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করা যায়, সেই বিষয়ে অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে বক্তব্য রাখে। তার বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তার বক্তব্যে ছিল গভীর প্রজ্ঞা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি। সেমিনারে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়। তারা বুঝতে পারে, এই কিশোরের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের এক মহৎ নেতা, একজন নিবেদিত স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী।

সেমিনার শেষে সেখানকার একজন বয়স্ক ও প্রভাবশালী অধ্যাপক হৃদয়ের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। অধ্যাপক হৃদয়কে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার গুরুত্ব বোঝান এবং তাকে আশ্বাস দেন যে, তিনি তার ভর্তির জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করবেন। হৃদয় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই সুযোগ গ্রহণ করে। সে উপলব্ধি করে, এই অপ্রত্যাশিত সাহায্য তার কাজের প্রতি মহান আল্লাহ্‌র দেওয়া পুরস্কার।

হৃদয় যখন শাপলাডাঙ্গা গ্রামে ফেরে, সে আর কেবল স্কুলের ছেলে নয়। তার মধ্যে এসেছে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও অঙ্গীকার। তার মনে তখন বীজ বোনা হয়েছে এক মহান লক্ষ্যের—প্রকৌশলী হয়ে দেশকে সেবা করার, যার পূর্ণতা আসবে ৪০ বছর বয়সে। সে গ্রামের মানুষের কাছে যায়, যাদের সমর্থন তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, এবং তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

এইভাবে কিশোর হৃদয়ের জীবন এক নতুন দিকে মোড় নেয়। তার প্রথম বিজয় তাকে পরিচিতি এনে দিয়েছে, কিন্তু এই পরিচিতি তার চরিত্রে বিন্দুমাত্র অহংকার যোগ করেনি। বরং এটি তাকে তার স্বপ্নের পথে আরও বিনয়ী ও ধৈর্যশীল করে তুলেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য প্রস্তুত হওয়াটা ছিল তার নীরব উপাখ্যানের পরবর্তী সোপান—যা তাকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য, অর্থাৎ দেশের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য প্রস্তুত করবে।


চলবে…….

সংবাদটি শেয়ার করুন :