সোপান: এক দেশপ্রেমিকের নীরব উপাখ্যান : পর্ব ১১
- আপডেট সময় : ০৯:০৭:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
- / 26
(পর্ব ১১ : জীবন ঝুঁকির মাঝে প্রজ্ঞা ও সমাবর্তনের প্রাক্কালে)
দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদার চক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হৃদয়ের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লেও, তার দৃঢ়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। তার এই নির্ভীকতা ছিল মহান আল্লাহ্র উপর তার অবিচল আস্থার ফল। সে বিশ্বাস করত, একজন প্রকৃত গোলামের কর্তব্য হলো ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা, জীবনের নিরাপত্তা আল্লাহর হাতেই ন্যস্ত। হৃদয় তার ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে চলতে থাকে, কারণ তার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি ছিল দেশের কল্যাণের দিকে, ব্যক্তিগত ভয় বা নিরাপত্তার দিকে নয়।
এই ঝুঁকি হৃদয়ের কাজে আরও বেশি প্রজ্ঞা ও সতর্কতা নিয়ে আসে। সে বুঝতে পারে, শুধু সততা দিয়ে হয় না, বরং কৌশলী হতে হয়। সে তার সব প্রমাণ ও গবেষণা নথিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সুরক্ষিত রাখে এবং তার বিশ্বাসী বন্ধুদের একটি ছোট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেগুলোর প্রতিলিপি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়। তার এই শৃঙ্খলা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা তাকে একজন আদর্শ ‘স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক’ হিসেবে গড়ে তুলছিল।

এই সময়ে এসে হৃদয়ের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সমাবর্তন সন্নিকটে। তার একাডেমিক ফল ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল, যা তার কঠোর অধ্যবসায় এবং কর্তব্যে নিষ্ঠার প্রমাণ। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এই সম্মান তার অহংকার বাড়ায় না, বরং তার নম্রতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে—সে মনে করে, এই জ্ঞান ও সম্মান দেশের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দেওয়া আমানত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময়েও তার প্রতি মেয়েদের নীরব আকর্ষণ বজায় থাকে। এইবার জুঁই, নিলুফা এবং প্রীতির সঙ্গে একই বিভাগে পড়া সুহাসিনী নামের একজন ছাত্রী হৃদয়ের নীরব দেশপ্রেমের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সুহাসিনী ছিল অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা এবং তার চোখে হৃদয় ছিল সেই আদর্শ, যার মধ্যে সে এক পবিত্র ও অসামান্য জীবনসঙ্গীর স্বপ্ন দেখত। সুহাসিনী তার অনুরাগ প্রকাশ করতে চাইলেও, হৃদয়ের চারিত্রিক গাম্ভীর্য ও নারীসঙ্গ থেকে দূরে থাকার নীতি তাকে বিরত রাখে।
হৃদয় এই নারীর প্রেমময় আকাঙ্ক্ষাগুলি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করত। তার কাছে নারীর উপস্থিতি ছিল কেবল পেশাগত সহযোগিতা বা সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এই সময়ে তার মনজুড়ে ছিল—কীভাবে সে তার প্রকৌশল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে টেকসই উন্নয়নের পরামর্শ দিতে পারে। তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: প্রকৌশলী হিসেবে দেশকে সেবা করা এবং রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের দিকে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সমাবর্তনের ঠিক আগে, হৃদয়ের কাছে দেশের অন্যতম বড় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব আসে। এই প্রস্তাব ছিল তার জন্য বিশাল এক প্রলোভন। কিন্তু হৃদয় তা প্রত্যাখ্যান করে। তার আত্মত্যাগ ছিল বিশাল—একটি নিশ্চিত ও বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে সে দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল। সে তার স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক হওয়ার স্বপ্নকেই বেছে নেয়।
চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের এই খবরটি তার শিক্ষক ও বন্ধুদের বিস্মিত করে। তারা বুঝতে পারে, হৃদয়ের দেশপ্রেম নিছক কথার কথা নয়, এটি তার জীবনের ব্রত। তার এই সিদ্ধান্ত তার নৈতিক মেরুদণ্ড ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ দেয়। তার পরিচিতির পরিধি এই একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের উচ্চশ্রেণির বিদ্বৎ সমাজের মধ্যে আরও ছড়িয়ে পড়ে।
হৃদয় সমাবর্তনের মঞ্চে উঠে শ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসেবে স্বর্ণপদক গ্রহণ করে। তার সমাবর্তন বক্তৃতায় সে দেশের তরুণদের আহ্বান জানায়—যেন তারা কেবল নিজের জন্য নয়, বরং দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে তাদের জ্ঞানকে উৎসর্গ করে। তার এই ভাষণ ছিল আবেগবর্জিত, কিন্তু প্রজ্ঞা ও গভীর দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ। এই মুহূর্তে সে অনুভব করে, তার গ্রামের সেই ১৪ বছরের কিশোর আজ একজন পূর্ণাঙ্গ দেশপ্রেমিক হওয়ার প্রথম সোপানটি অতিক্রম করেছে।
সমাবর্তন শেষে হৃদয় তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়। তার এই বিজয়যাত্রা ছিল নীরবে অর্জিত এক বিশাল সাফল্য। সে তার বাবা-মায়ের কাছে কৃতজ্ঞতা জানায় এবং তাদের কাছে দোয়া চায়—যেন সে তার আগামী জীবনেও আল্লাহর একজন প্রকৃত গোলাম হিসেবে মানুষের সেবা করতে পারে এবং কোনো লোভ বা অহংকার তাকে স্পর্শ না করে।
এভাবেই হৃদয়ের নীরব উপাখ্যান তার জীবনের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে একজন স্বাধীন গবেষণা প্রকৌশলী ও পরামর্শক। তার সামনে এখন গোটা দেশ। নারীর ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত আরামের চিন্তা বাদ দিয়ে সে তার পরবর্তী লক্ষ্য—দেশের প্রায় সকল অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করে তার স্বপ্নের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়।


















